সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত ব্যাতিক্রমধর্মী দ্বীপ : ম্যারিনা বে স্যান্ডস 

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : অদ্ভুত স্থাপত্যশিল্পের দেখা মিলে ম্যারিনা বে স্যান্ডস, সিঙ্গাপুরে

ছবি : এপেল

যান্ত্রিকতায় ঘেরা ঝকঝকে-তকতকে আর নয়নাভিরাম আলোকসজ্জায় সজ্জিত একটি দেশ সিঙ্গাপুর। প্রথম বিশ্বের একটি দ্বীপরাষ্ট্র কিংবা একটি শহুরে রাষ্ট্র বিলাসিতায় সাজানো গোছানো হবে এটা আমরা সিঙ্গাপুর নামটা উচ্চারণ করেই বলে দিতে পারি। যদিও অতীত অতটা সহজ ছিল না ছোট্ট এই দ্বীপ রাষ্ট্রের। সত্তরের দশকে আবাসন সমস্যা আর ব্যাপক বেকারত্বের মতো সমস্যাকে মোকাবিলা করে অবকাঠামোখাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি খুব আস্তে আস্তে তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে প্রথম বিশ্বের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বড্ড বেশি যান্ত্রিকতায় গড়া এই শহুরে দেশটি ব্যাতিক্রমধর্মী স্থ্যাপত্যশৈলী এবং অভিজাত খাবারের জন্য বিখ্যাত। লি কুয়ান ইউ এর পরিকল্পনায় সিঙ্গাপুরে ধীরে ধীরে নির্মাণ করা হয় চোখজুড়ানো সব নিদর্শন, বিশ্বের দামি দামি সব স্থাপত্যগুলোর একেকটি। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর ফ্লাইয়ার, মেরিনা বে স্যান্ডস, বোটানিক্যাল গার্ডেন, গার্ডেন্স বাই দা বে, চায়নাটাউন, সেন্টোসা আইল্যান্ড, নাইট সাফারি ও সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা একেবারেই পরিচিত কয়েকটি স্থাপনা। প্রচুর অর্থ আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়া নতুন সিঙ্গাপুরে যেন কোথাও নেই সেই পুরোনো সিঙ্গাপুরের প্রতিচ্ছবি।

৫৭ তলা বিশিষ্ট  অভিজাত রিসোর্ট কমপ্লেক্স, ম্যারিনা বে স্যান্ডস। ছবি : ফোকাস গেমিং নিউজ

খুব বেশি অবাক করা ব্যাপার এটা যে, সারাক্ষণ ব্যস্ত ছুটে চলা মানুষের দেশ সিঙ্গাপুরে সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্থাপনা অবস্থিত। ম্যারিনা বে স্যান্ডস (Marina Bay Sands) হচ্ছে সিঙ্গাপুরের একটি অত্যাধুনিক অভিজাত রিসোর্ট কমপ্লেক্স। ৫৭ তলা বিশিষ্ট বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ম্যারিনা বে স্যান্ডস ২০১০ সালে নির্মাণ করা হয়। মূলত ম্যারিনা বে স্যান্ডস (Marina Bay Sands) একটি উপসাগর যা সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত এবং তিনটি পরিকল্পিত এলাকা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এগুলো হল ডাউনটাউন কোর, পূর্ব ম্যারিনা ও দক্ষিণ ম্যারিনা। এর চারিদিকের পার্শ্ববর্তী এলাকাকেও ম্যারিনা বে বলা হয়। ম্যারিনা বে যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ আরেকটি শহর। এর প্রাণকেন্দ্র হলো ম্যারিনা বে হোটেল। ৬ বিলিয়ন ডলারের এই অত্যাধুনিক রিসোর্ট কমপ্লেক্সটির উচ্চতা ১৯৪ মিটার। ম্যারিনা বে স্যান্ডসে রয়েছে আবাসিক হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, বিশ্বের সেরা সব ব্র্যান্ডের শোরুম, কৃত্রিম আইস স্কেটিং কোর্ট, রেস্টুরেন্ট, থিয়েটার, জিমনেসিয়াম, শপিংমল, ক্যাসিনো।

এখানেই রয়েছে অলিন্দে ক্যাসিনো যা বিশ্বের বৃহত্তম ক্যাসিনো, আর্টসায়েন্স মিউজিয়াম এবং ম্যারিনা বে স্যান্ডস স্কাইপার্ক। স্কাইপার্ক থেকে এক নজরে গোটা সিঙ্গাপুর দেখা যায়।দ্যা ম্যারিনা বে স্যান্ডসের ৫৭ তালায় অবস্থিত বন্দরমুখী পর্যবেক্ষণ ডেক এবং একটি ইনফিনিটি পুল। হোটেলের গেস্টদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় এটি একটি স্থান। যদিও কেবল হোটেল গেস্টরা এই ইনফিনিটি পুল ব্যবহার করতে পারেন তবে যে কেউই পর্যবেক্ষণের ডেক দেখতে পারেন। বেশিরভাগ পর্যটক যারা সেই হোটেলে থাকেন না তারাও ভিড় জমান সেখানে। আর সেলফির যুগে মুঠোফোনে বন্দি করে রাখেন নয়ানাভিরাম সৌন্দর্যকে। পর্যটকেরা আলোকচিত্রের মাধ্যমে যেন সময়কেই আটকে ফেলে ফ্রেমের চৌকোনো জায়গাটুকুতে।সুতরাং ছবি তুলতে ভুলে যাওয়া উচিত না কোনো ভ্রমনপিয়াসুর।

আপনার কল্পনাকে বাস্তব করবে ইনফিনিটি পুল। ছবি : ট্রিপএডভাইজর

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দু'শো মিটারের কাছাকাছি উপরের এই তলায় রয়েছে এই ইনফিনিটি পুল। ম্যারিনা বে স্যান্ডসের তিনটি স্কাইস্ক্র্যাপার এর উপর অবস্থিত একটি জাহাজ এবং সমগ্র সিঙ্গাপুরকে দেখার এই ডেক এবং ইনফিনিটি পুল অবস্থিত এই জাহাজের মধ্যে। খুব অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্যি এটিই যে ম্যারিনা বে স্যান্ডস স্কাইপার্কের উপরে অবস্থিত এই জাহাজ। কি অদ্ভুত স্থাপত্যশিল্প! ভাবতেই কেমন লাগে যে একটি জাহাজ ম্যারিনা বে স্যান্ডসের তিনটি স্কাইস্ক্র্যাপার এর ওপর অবস্থিত আর পর্যটকেরা শুধু পুরো সিঙ্গাপুরকে এক নজরে দেখার জন্য জমায়েত হয় সেখানে। এই ভবনের মোট খরচ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। ম্যারিনা বে স্যান্ডস (Marina Bay Sands)  এ যা যা দর্শনীয় :

  • ম্যারিনা বে স্যান্ডস
  • ম্যারিনা বে স্যান্ডস স্কাইপার্ক
  • সিঙ্গাপুর ফ্লায়ার
  • হেলিক্স ব্রিজ
  • মারলিয়ন পার্ক
  • ক্লার্ক কুয়ে
  • আর্ট সাইন্স মিউজিয়াম
  • ম্যারিনা বে স্যান্ডস
  • এর ঠিক পাশেই গার্ডেন বাই দ্যা বে
গার্ডেন বাই দ্যা বে। ছবি : ট্যুর স্কেনার

 ইজরায়েলিয়-কানাডিয়ান স্থপতি মোশে সাফদি এটির ডিজাইনার। লাস ভেগাস স্যান্ডস এটির ডেভেলপার এবং স্বত্বাধিকারী। সেই সময়ে নির্মিত সবচেয়ে ব্যায়বহুল সম্পত্তি ছিল ম্যারিনা বে স্যান্ডস। সৌন্দর্যপিয়াসু এবং কেনাকাটা পাগল পর্যটকদের ম্যারিনা বে স্যান্ডস যেন স্বর্গ স্বরূপ। তবে পকেটে পয়সা নিয়ে ঠিক কুলোবে কিনা বলা কঠিন। তাই কয়েক রকম কার্ড সঙ্গে নিয়ে তবেই যেতে হবে। বিশ্ববিখ্যাত সব ব্র‍্যান্ডই আছে সেখানে। আপনাকে খুঁজতে হবে নেই কোনটা! আর ব্যায়বহুল হওয়ার কারনে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত এই ম্যারিনা বে তে শপিং করতে যাওয়ার আগে ক্রেডিট কার্ড নিতে ভুললে যে চলবে না তা বলাই বাহুল্য। আসুন ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার পরিবেশ নষ্ট না করার জন্য সতর্ক হই। পরিবেশবান্ধব জিনিসপত্র ব্যবহার করি এবং যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকি। তবে এখানে বলতে হয় সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশে যত্রতত্র ময়লা ফেলার জন্য জরিমানা গুনতে হয়। জরিমানা না গুনে বরং আমরা নিজেরাই পরিবেশ রক্ষার্থে সোচ্চার হই। শুধু দেশের বাইরে ভ্রমণে গিয়ে সতর্কতা নয়,দেশ রক্ষার্থেও সতর্কতা চাই।  


  তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া,  ম্যারিনা বে স্যান্ডস ওয়েবসাইট